দাম্পত্য বিচ্ছেদের অবিচ্ছেদ্য সন্তানের জীবনের গল্প
প্রথম পাতা » মুক্ত মত » দাম্পত্য বিচ্ছেদের অবিচ্ছেদ্য সন্তানের জীবনের গল্প


মঙ্গলবার ● ১৯ জুন ২০১৮

--- বাতাসে আজ পোলাপের গন্ধ।কাঁচা মেহেদী পাতার সুভাসের সাথে সানাইয়ের বিহ্বল সূর একাকার। হলুদের রঙ্গে রাঙ্গানো নীল সন্ধা। তারকারাজির দ্রুত আগমনে সাঁজের মায়ায় কাজল বরনে সাজানো ধূসর। লাল নীল জোনাকী তরঙ্গের আলোতে হৃদয়ের মিটিমিটি স্পন্ধন একাকার। অগনিত মানুষের মাঝে শুধু একজন মানুষকে খুজে নেওয়ার দিন। দুই জীবন এক মোহনায় মিলনের অববাহিকায় অনেক মানুষের সমাগম। রঙ্গ বেরঙ্গের আলোয়ে আলোকিত ত্রিভূবন। আমাকে বিবাহের সিঁড়িতে বসতে হবে। পাত্র পক্ষের করুনায় আমার পাত্রস্থ হবার হাতবদল। মামাদের ইজ্জত রক্ষার শেষ অর্থদন্ডের বুক চাপা ক্ষোভ। দ্রুত বিদায়ের করুন সূর। আমার বেঁচে থাকাই পৃথিবীর নিকট বিরক্তর। সুবিধা বঞ্চিত বৈরিতার মাঝে আজ আমার বিবাহ।

আমার জন্মের তিন মাস পরে আমার পিতা-মাতার বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। কেন এবং কি কারনে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে তাহা আমার জানার কথা নয়। পরস্পরের অভিযোগে দু’জনে অভিযুক্ত ছিলো। আমার বিরুদ্ধ কোন অভিযোগ না থাকার পরেও আমি মা-বাবার বিবাহ বিচ্ছেদের নিষ্ঠুর নির্মমতার স্বীকার হয়েছি। তিন মাস বয়সী দুগ্ধপোষ্য শিশুর জীবনে মায়ের কোলই ছিলো তার নিরাপদ পৃথিবী। বাবা আমার মায়ের মোহরানার পাওনা চুকিয়ে দিয়ে আমাকে আমার পিতৃত্বের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে বিদেশের ঠিকানায় ঠিকানায় হারিয়ে গেছেন। বাবার হৃদয়ের কোন প্রকোষ্ঠ আমার জন্য একটু জায়গা ছিলো কিনা তাহা আমার জানা ছিলো না।

আমার মা একটি মাত্র কন্যা সন্তানের জননী। স্বামীপরিত্যাক্তা কম বয়সের একজন সুন্দরী নারী পিত্রালয়ে স্বাধীন সত্বা নিয়ে বেশী দিন টিকে থাকতে পারে না। আমি একেতো কন্যা সন্তান তারপর পিতা পরিত্যাক্তা, সর্বশেষ যুবতী মায়ের বোঝা হয়ে মামাদের বাড়ীতে আমার বেড়ে উঠা। নানার বাড়ীর সকলের সিদ্ধান্ত মাকে পূনরায় পাত্রস্থ করতে হবে।স্ত্রী পরিত্যাক্ত নুতন স্বামীর সাফ জবাব আগের ঘরের কন্যা সন্তান তাদের বাড়ীতে নিষিদ্ধ।অজানা এক ঘুমের ঘরে আমাকে নানুর হেফাজতে রেখে আশ্রুসিক্ত নয়নে মা তার নুতন স্বামীর বাড়ীতে পদার্পন করেন।জাগতিক প্রয়োজনের কাছে মানুষের স্নেহ মমতা ভালোবাসার কোন মূল্য নেই। নানুর স্নেহ মমতায় আমি
কখনো আদর,কখনো ভালোবাসা আবার কখনো তাচ্ছল্যের সাথে নিবিড় ভাবে পরিচিত হই।

অবহেলা অযত্নে পিতা মাতা বিহীন জগত সংসারে আমার জীবনের সাথে বাড়ীর গৃহপালিত পশুর কোন প্রার্থক্য ছিলো না। ঈদ আনন্দ-পর্বনে আমার বয়সী মেয়েরা বাবার গলা জড়িয়ে ধরে যখন কিছুর বাহানা করতো তখন আমি অন্তর চক্ষু দিয়ে আমার জীবনের অঘোষিত সম্রাট আমার কাল্পনিক বাবাকে খুজতে থাকি। জীবনে কোন দিন বাবাকে দেখার সুযোগ হয়নি।সকলের মুখে শুনেছি আমি নাকি দেখতে বাবর মত। আমার নিজ শরীরের মাঝে বাবার আত্মার অনুভব খুজতে থাকি।কল্পনায় আঁকা বাবার মত অনেককে দেখে আনমনে বাবা মনে করে তীক্ষ্ণতা দিয়ে তাকিয়ে থাকি। বাবার বয়সী অগনিত মানুষকে আমার বাবা বলেই মনে হতো।আমি যাদেরকে বাবার মত মনে করেছে তারা কেউ আমাকে মেয়ের মনে করেনি।

মাকে দেখতে অনেক কেঁদেছিলাম। সৎ বাবার সাফ কথা পরের ঘরের সন্তানদের সাথে আমি মেলামেশা করলে তার সন্তান নষ্ট হয়ে যাবে। আমার বাবা ভালো লোক ছিলো না, এই অভিযোগে আমি অভিযুক্ত হলাম। মাতৃ গর্ভে আমাদের ঠিকানা এক হলেও ভূপৃষ্ঠের পৃথিবীতে আমাদের আবাস ভূমি এক নয়। মায়ের নিরবে অশ্রু বিসর্জন ব্যাতিত আর কোন পথ খোলা ছিলো না। এক স্বামীর ঘর ভেংগে যাওয়ার
ভয় মা সব সময় ভীত থাকেন।মামীর আদেশ পালন করাই ছিলো আমার এবাদত। ছোট মামা প্রি প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি করয়ে দিলেন। সব ছেলে মেয়েরা স্কুল ব্যাগে বই নিয়ে স্কুলে আসে,আমি একটি ব্যাগের জন্য অনেক কেঁদেছিলাম। মামী আমার স্কুল বন্ধ করে দেওয়ার হুমকী দেওয়ায় কান্না থেমে যায়। স্কুল শেষে একটি আইসক্রিম খাওয়ার জন্য মামার নিকট অনেক আবদার করেছিলাম,মামা বলেছেন বাড়াবাড়ী করলে আমাকে দাদার বাড়ী পাঠিয়ে দিবেন। ভয় আর প্রত্যাখ্যাত হওয়ার মাঝে আমার বায়না হারিয়ে গেলো।

বাড়ীর কাজের মেয়ের অভাব আমি পূরন করি। নিবৃতে পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম অধ্যায় অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করি।সকলের অগোচরে বইয়ের সাথে কথা বলি। বই কিভাবে মানুষের জীবনের অন্ধকার দূর করে আলোর পথ দেখায় জানতে চেষ্টা করি। প্রকৃতির নিজের হাতে আঁকা মানচিত্রের পথ ধরে আমি শিশু কন্যা থেকে বালিকার পথ অতিক্রম করে ফূলের রঙ্গে রঙ্গ ধারন করেছি। আজ আামার নিজ মাকে আর মাতৃত্বকে একত্রে অনূভব করি। আমি আমার মাঝে সীমাবদ্ধতার কথা অনুভব করে মায়ের প্রতি আমার অতীতের সকল অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেই। একজন নারীর পরাধীনতার শৃঙ্খল কত শক্ত তাহা অনূভব করি। পাশের বাড়ীর ভালো একজন ছাত্রের নিকট অংক শিখতে চাইলে তার মা পরিস্কার জানিয়ে দেন পরের বাড়ীর কাজের মেয়ের সাথে কথা বলা যাবে না,তাদের ছেলে ফাঁদে আটকে যাবে।

আমি বনফুলের মত পরিচর্যাবিহীন প্রস্ফুটিত ছিলাম। কোকিলের মধুর সূর আমার হৃদয়কে স্পর্শ করতে শুরু করে। চুলের খোঁপায় লাল ফুল দিতে ইচ্ছা করেছিলো। মা-বাবার দাম্পত্য বিচ্ছেদের পরিত্যাক্ত সন্তনের জীবনে সকল ফুলের বর্ণ কালো হয়।অবহেলিত জীবনে কোন ভালোবাসা থাকতে পারে না। জীবনের ফুটন্ত পাপড়ি সংকুচিত করে নিলাম। বসন্তের বাতাস প্রবেশের পথ বন্ধ হয়ে গেলো। আমার বিদ্যালয় কখনো আমাকে বিদ্রুপ করে নাই। আশাহত একজন ছাত্রীকে আশার আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। ম্যাট্রিকুলেশন শেষ করে সদর কলেজে ভর্তি হয়েছি। টিউশনি করেই কলেজের খরচ জোগাড় হলো। মামাদের পরিবারের সকলেই সম্মান রক্ষার্থে দ্রত পাত্রস্থ করতে উদগ্রীব হয়ে পড়লো। আমার জন্য দোকানের কর্মচারী থেকে শুরু করে গাড়ীর হেলপার পর্যন্ত পাত্র দেখা হলো।

ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগে পরীক্ষা দিলাম। একদিন সকালের সূর্যের রক্তিম আলো দেখেই আমি অনুমান করতে পারি আমার জীবন আকাশের মেঘ সরতে শুরু করেছে। সরকারী চাকুরীর সুসংবাদে সমগ্র গ্রামে আনন্দ ছড়িয়ে পড়লো। কলেজে মিষ্টি বিতরনের নুতন যোগদান করা শিক্ষক আমার বাড়ীর ঠিকানা জানতে চেয়েছেন।প্রিন্সিপল স্যারের সরাসরি জবাব হলো মেয়ে পছন্দ হয়েছে কিনা বলো।তিতাস স্যার স্মাট সুশিক্ষিত বি সি এস উত্তির্ন একজন মানুষ আমাকে পচন্দ করবে তাহা আমার কল্পনার অতীত। সকল শিক্ষকের অনুদান আমার জীবনকে পাল্টে দিলো। পাত্র পক্ষ বিবাহের দিন ধার্য্য করলো।

আজ আমার জীবনের এক মহেন্দ্রক্ষন। মামাদের যৎসামান্য আয়োজনে অলংকার বিহীন অনাড়ম্বর ভাবেই আমার জীবন অধ্যায়ের পরিবর্তন হবে। আজকের দিনটিতে দু’জন মানুষ আমার খুব বেশী প্রয়োজন। আমার বাবা আর জন্মদাত্রী মা। দূরের জেলা থেকে পাত্র পক্ষের সকল মেহমান হাজির হলো। অনুষ্ঠানে আমার বাবাকে বারবার তলব করা হলো। বড় মামা জড়োসড়ো হয়ে আমার অন্ধকার অধ্যায়টি ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করে ব্যার্থ হন। আমার হবু শশুরের এক কথা, মেয়ের পিতার পরিচয় না থাকলে এই বিবাহ হবে না। ছোট মামা সত্য প্রকাশ করে দিলেন।আমার বর সহ সকলেই বিবাহের আক্ত পরিবরতন করে শুধু বায়নাপত্রের অনুষ্ঠানে নিয়ে আসলেন। যে মেয়ের বাবা মা দু’জনে অন্নের ঘর করে সেই মেয়ে সরকার বাড়ীর বউ হতে পারে না।

আমার মাথায় আকাশ ভেংগে পড়লো। মা-বাবার বিচ্ছেদের গ্লানি সমগ্র জীবনের দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত দিয়েও শোধ হলো না। বাবাকে কোন দিন না দেখেও বাবার এতো প্রয়োজন! মা পাশে থাকলেও আজ অর্ধেক পূর্নতা পেতো। নিজ যোগ্যতায় নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পরেও বাবার শূণ্যতা আমার জীবনে অপূর্ন থেকে যাবে।পাত্র পক্ষের অনাগ্রহের কারনে আমি স্বীদ্ধান্ত পরিবর্তন করি। বাবার পরিচয় ব্যাতিত যদি একজন মেয়ে মানুষের বিবাহ আটকে যায় সেই পরাধীন বিবাহ আমার প্রয়োজন নেই। বিবাহের ক্ষুদ্র আয়োজন ভেংগে গেলো।হাতের মেহেদী রং গুলো উঠতে না চাইলেও বর পক্ষ অনায়েসে উঠে গেলো। কোলাহল থেমে গেলো। বিবাহ ভেংগে যাওয়ার করুন বিহ্বল সূর আমার বুকের ভিতরে ধুমড়ে মুচড়ে চুরমাচুর করে দিয়েছে।

পৃথিবীতে বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা ভাবতে থাকি। একটি হাত আমার মাথাকে স্পর্শ করলো। ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তার আলোর তরঙ্গ দিয়ে আমার মুখ ঘুরিয়ে দিলো। অর্ধপাকা চুলের অভিজাত্যতায় আমি স্তম্ভিত হই। লোকটি যেন আমার জনম জনমের চেনা। লোকটি আমাকে বললেন তুমি আমাকে হয়তো চিনবে না। তুমি আমার মা। তুমি তোমার বাবার হৃদয়ে সবটুকু জায়গা দখল করে আছো।আমার উপার্জিত অর্থের সকল মালিকানা তোমার। তোমার কোন অংশিদার নেই। আমার দাম্পত্য বিচ্ছদের পর থেকেই আমি বিদেশে একাকী জীবন অতিবাহীত করেছি। দীর্ঘ বছর পরে বাবা প্রথম বিদেশ থেকে আমাকে দেখতে এসেছে। বড় মামা জানালেন তিনি তোমার বাবা। মুহুর্তেই আকাশের আলোর ঝিলক আমার মুখমন্ডল আলোকিত করে দিলো। বাবার সান্বিধ্যে ক্ষনিকেই জীবনের সকল গ্লানী মুছে দিলো। আমার শশুর আমার হাত ধরে ক্ষমা চাইলেন। একজন বাবা তার মেয়ের জীবনে কখনো অনুপস্থিত থাকে না অনুভবে সমগ্র জীবন জড়িয়ে থাকে। দাম্পত্য বিবাহ বিচ্ছেদের সমাজ সভ্যতার নির্মমতার গ্লানী সন্তানদেরকে বহন করতে হয়।

এড. মিজানুর রহমান
জজ কোর্ট,লক্ষীপুর।

বাংলাদেশ সময়: ২১:৩০:৫৫ ● ৩৭৪ বার পঠিত



পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)



আরো পড়ুন...