বাঙ্গালী সাংস্কৃতির পহেলা বৈশাখ ও ধর্মীয় অনুভব
প্রথম পাতা » ফটো গ্যালারি » বাঙ্গালী সাংস্কৃতির পহেলা বৈশাখ ও ধর্মীয় অনুভব


শুক্রবার ● ১৩ এপ্রিল ২০১৮

---সাংস্কৃতি প্রত্যেক জাতির জাতিসত্বার মূল ভিত্তি এবং সভ্যাতা মাপকাঠির সমাজিক দর্পন।যে জাতি সাংস্কৃতিতে যত বেশী সভ্য সেই জাতী ততবেশী উন্নত। মানুষ যুগ যুগ ধরে নীজের মত করে সাংস্কৃতিকে লালান পালন করে আসছেন। প্রাগঐতিহাসিক যুগ থেকেই মানুষ কখনো কখনো ধর্ম ও রাজার-নীতিকে জোর পূর্বক প্রতিস্থাপিত করেছেন আবার কখনো জোর জবরধ্বস্তী না করে স্বেচ্ছাধীন স্বাধীন মতামতের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। মানুষ তাদের নিজস্ব কৃষ্টি ও সাংস্কৃতির ধারা অক্ষুন্ন রেখে ধর্মীয় ও রাজার নীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়েছেন। সাংস্কৃতি একটি জাতী স্বত্বার অন্তরের ভাষা। কোন শব্দ উচ্ছারন না করেও মানুষ তার সাংস্কৃতিক অভিব্যাক্তি প্রকাশ করেন। বাক প্রতিবন্ধীরাও ভাস্কার্য, চারু কলা,চিহৃ, সৃষ্টিকর্ম দিয়ে সাংস্কৃতিকে ধারন করতে পারে।

সাংস্কৃতিক মুক্তি ব্যতিত মানুষের বিশুদ্ধ আত্মিক জীবনের পরিশুদ্ধতা অর্জন হতে পারে না। বাঙালী মুসলমানরা ইরান, আফগানিস্থান কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে থেকে আসা পীরমাখায়েস,মোগল সম্রাট,সূফীবাদের মাধ্যমে অর্জিত পবিত্র ধর্মদর্শন গ্রহন করেন। শত সহস্র বছরেও ঐ সকল দেশের মানুষের আচার আচরন,রীতিনীতি, পোষাকপরিচ্ছদ, সংগীত,পারিবারীক বৈশিষ্ট,সামাজীক জীবনের মূল্যবোধ বাঙ্গালী মুসলমানরা গ্রহন করেন নাই। হাজার বছরের সহজাত বৈশিষ্টের অনেক সংযোগ স্থাপন হলেও নিজ কৃষ্টি কখনো বিলুপ্ত হয়নি।বাঙ্গালী মুসলমানরা তাদের মত করে নিজদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট অক্ষুন্ন রেখেই ধর্ম কর্ম পালন করে আসছেন। সেক্ষেত্রে ধর্মের সাথে জাতীসত্বার সাংস্কৃতির কোন বিরোধ হয়নি।

মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশে সাংস্কৃতির প্রভাব ব্যাক্তি জীবন, সমাজ, রাষ্ট্রিয় ও অর্থনৈতিক জীবনকে প্রভাবিত করে। সাংস্কৃতি মানুষের নৃতাত্বিক, আঞ্চলিক, ভৌগলিক, ধর্মীয়,চারু,কারু,খাদ্য গ্রহন, ভাষা, বর্ন বৈশিষ্টের প্রভাব সহ মানব জীবনের সকল প্রবাহ একত্রে মিলিত একটি মোহনার নামই সাংস্কৃতি বা কৃষ্টি। বাঙ্গালী একটি সত্বার পরিচিতি। ইসলাম ধর্ম একটি আত্মিকরন সহজ ধর্ম। পৃথিবীর দেশে দেশে ইসলাম ধর্ম প্রসারিত হওয়ার পরে বিভিন্ন জাতিগোষ্টির অতীত কৃষ্ট্রির সাথে বিরোধ সংঘাত না করেই নিজদেরকে প্রতিস্থাপিত করতে সক্ষম হয়েছে। ইসলাম ধর্মের এই অসাধারন সহনশীলতা (tolerance) ইসলামকে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী ভাবে স্থান করে নিতে সাহায়ক হয়েছে। সেই কারনে মানুষ একবার ইসলাম ধর্ম গ্রহন করার পরে আর কখনো এই ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করার ইতিহাস জানা যায় না। এই ভূখন্ডের মানুষ সনাতন থেকে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহন করেছেন তার পর ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেছেন।

ধর্মের সাথে সম্পর্কিত সাংস্কৃতি এবং ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক সাংস্কৃতি( culture contact with the religion and culture conflict with the religion) এই দুই ধারার মুখোমুখী দান্ধিক প্রতিযোগিতায় ধর্মের সাথে কোন বিরোধ না হয়েই বাঙ্গালী সাংস্কৃতি শত সহস্র বছরে নিজস্ব স্বকিয়তায় সম্বৃদ্ধি লাভ করে।ইসলাম ধর্ম কোন প্রান্তের জাতিগোষ্টির নিজস্ব কৃষ্টিকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা করেন নাই। এমনকি আরব বিশ্বের অতীত কৃষ্টি কালচারকেও তারা পরিত্যাগ করে নাই। আনন্দের উলু ধ্বনি আজো তাদের সাংস্কৃতিতে বহাল আছে। ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ার মুসলমানরা তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতির সাথে ইসলামকে সুন্দর ভাবে খাপখাওয়া নিতে সক্ষম হয়েছে। পোষাকের অবয়ব লম্বা জামাকাপড়ের সাথে মাথায় পাগড়ীর উপরে কালো ফিতার চাপযুক্ত পোষাক বাঙ্গালী বা এশিয়া মহাদেশের কোন মুসলমান সাংস্কৃতির সাথে খাপ খাওয়াতে পারে নাই। পাকিস্থান জনগোষ্টির রুটি খাদ্যাভ্যাসের সাথে কাবলি পোষাক বাংলার কোন মুসলামানই গ্রহন করতে পারে নাই। লুঙ্গী,সার্ট,পাঞ্জাবী, পেন্ট, গেন্জি, সুট,বিংবা সখের বশবতি যে কোন জাতিগোষ্টির পোষাকই বাঙ্গালীর আরাম দায়ক পোষাক। মাছে ভাতেই বাঙ্গালীর নিত্য দিনের খাদ্যাভ্যাস। উন্নত ফাষ্টফুডের সাথে একটি উন্নত শ্রেনীর ফাষ্ট লাইফ পরিচালনায় অভ্যস্ত হলেও বাঙ্গালী জাতিগোষ্টির মৌলিকত্ব মাছে ভাতে বাঙ্গালী। মাছের সাথে পরিচিত হলেই বাঙ্গালীকে ইলিশ মাছকেই আন্তর্জাতিকতায় সম্বৃদ্ধ করে থাকে।

শিশুদের আকিকা উৎসব, বাঙ্গালীর বিবাহ বাড়ীর অন্দরমহলে গানের উৎসব,পালকিতে করে বর কনের আগমন,গরুর গাড়ীতে করে গাড়িয়াল ভাইয়ের উদাস করা গানের সূর,গ্রামের অর্ধঘোমটা পরা পল্লিবধূদের ঢেকিতে পায়ের তালে ধান থেকে চাউল মড়ানো,রিক্সায় কাপড় মোড়ানো গ্রামীর নারীর পিত্রালয় থেকে শশুর বাড়ী আগমন,কুমারের মাটির তৈরীর উপকরন,মাটির সানকিতে করে হাজার বছরের খাদ্যাভ্যাস, অধীক সংখ্যক জনগোষ্টির অতীতের প্রধান খাদ্য পান্তাভাত পোড়ামরিচ, নৌকায় চড়ে বানিজ্য ভ্রমন,তালের ভেলায় নাইউর নেওয়া, হাঁস মুরগীর পরিচর্যার ধরন,গোবাদী পশুর সাথে মানুষের আত্মিক অবস্থান,নবান্ন উৎসব,বৈশাখী মেলা,গ্রামীন যাত্রাপালা,জারী-সারী গানের আসর,কবি গানের পালা,রাখালিয়া বাঁশির সূর, কাবাটি খেলা, উন্মুক্ত হাট-বাজার, সাপখেলা,বেদেদের জীবনকথা, গরুর দৌড়,নৌকা বাইস,মুরগীর লড়াই,সাপ-বেজীর লড়াই,গরুর গাড়ীতে বধূ বরন,ধানকাটার উৎসব,ঈদ আনন্দ,জাতীয় পাখি দোয়ের,জাতীয় প্রানী বাঘ, গ্রামীন উৎসব সহ বিভিন্ন পর্বন বাঙ্গালী জাতীর অতীত মৌলিক সাংস্কৃতির বুনিয়াদ। যেই জাতি তার অতীত সাংস্কৃতিকে লালন করতে সক্ষম সেই জাতী ভবিষ্যত সাংস্কৃতির শক্ত ভীত তৈরী করতে সক্ষম হন। যেই জাতীর অতীত কোন ঐতিয্য নেই সেই জাতী বিলুপ্ত হবার সম্ভাবনা থাকে। পৃথিবী থেকে হাজারো জাতিগোষ্টি তাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় তারা বিলুপ্ত হয়েছে। অনেক শহর নগরী জনপদ বিলুপ্ত হয়েছে।

বাঙ্গালীর এই জীবনধারার সাথে এই সকল সাংস্কৃতি সম্পৃক্ত হয়ে মিলেমিশে একটি জাতিগোষ্টি তৈরী হয়েছে। বাঙ্গালী আর বিহারীদের জীবনধারা কিংবা মাদ্রাজিদের জীবনধারা এক হওয়ার কথা নয়। বাঙ্গালী মুসলমানরা তাদের ধর্মীয় সাংস্কৃতিকে হৃদয় দিয়ে লালান করে। মোক্তবে আরবি পড়া,মসজিদে সিন্নি,মাংসরুটি বিতরন,মিলাদমাহফিল, হুজুর, পীর মাখায়েসকে সমিহ করা, সবেবরাত,সবে কদর,রমজানের ইফতার, সেহেরী,ঈদ আনন্দ,কোরবানী এই সকল ধর্মীয় বিধিবিধান হৃদয় দিয়ে লালন করে। হিন্দু বৌদ্ধ,খৃষ্টান ধর্মের বেলায়ও তাদের নিজস্ব ধর্ম কখনো নিজেদের মত করে কখনো সার্বজনিন ভাবে মিলে মিশে বাঙ্গালী সাংস্কৃতির মূল স্রোতের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে। অনেক নদীর পানি যেমনি একটি মোহনায় মিলিত হয় তেমনি সকল মতের ধর্মের মানুষের বৈশিষ্টের সমন্বয়ে একটি কৃষ্ট্রি বা সাংস্কৃতি (culture) বিনির্মান হয়।

অনেক পশ্চাদপদ মস্তিস্ক সাংস্কৃতির সাথে ধর্মীয় ভাবধারাকে মুখোমুখি করার চেষ্টা করেছেন।পৃথিবীর সকল মুসলিমদের ভূখন্ড এক সীমানা প্রাচীরে বেষ্টিত নয়। একই ধর্মের হলেও একটি মাত্র জাতিসত্বা তৈরী করার জন্য ভিষামুক্ত,ক্ষুদা ও দারীদ্র মুক্ত, মুসলিম উম্মা তৈরী করা হয়নি। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সাথে বিরোধ সৃষ্টি করে সাংস্কৃতিকে পরাজিত করে পাকিস্তান বা আফগানিস্থানী জাতীর মত একটি স্যাড জাতি তৈরী হবে। ভারতবর্ষের মানুষ ধর্ম আর সাংস্কৃতিকে একত্রিত করে একটি সম্পুর্ন হৃদয়াঙ্গম সাংস্কৃতি গড়ে তুলেছেন। ভারতীয় অধিকাংশ টি বি চ্যানেলে দেব দেবীর ফেন্টাসী জাতীয় ইমাজিনারী ড্রিম তৈরী করে নিত্য নুতন সাংস্কৃতিক দিক উন্মোচন করেন তাতে মত পার্থক্য কিংবা দাঙ্গাহাঙ্গামা কিংবা ধর্মের অবমাননাকর কোন সভা সমাবেশ বিবৃতি বা প্রতিবাদ ঝড় উঠেনি।

সাংস্কৃতির কোন ভূখন্ড নেই কিন্তুু প্রত্যেক ভূখন্ডেরই একটি সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল থাকে।কৃষ্টি,ঐতিহৃ,সাংস্কৃতিতে পরিপূর্ন একটি জাতীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঘাটতি থাকলেও সেই জাতি টিকে থাকতে পরে। কিন্তু সাংস্কৃতি হারিয়ে গেলে সেই জাতীস্বত্বা টিকে থাকতে পারে না। শিক্ষার মতই সাংস্কৃতি জাতীর জীবনে গুরুত্বপুর্ন অধ্যায়। ধর্মের সাথে সাংস্কৃতির বৈরীতার সাংস্কৃতি পরিহার করতে হবে।কোন মুসলমান তার নিজ ধর্ম পরিত্যাগ করার সাংস্কৃতি নেই বললেই চলে।হাজার বছরের বাঙ্গালী মুসলমানরা বাঙ্গালী সাংস্কৃতি ধারন করে কেউ অমুসলিম হয়ে যায়নি বরং যারা পশ্চাদপদ চিন্তা লালন করেন তাদের দর্শনে উৎপাদিত জেনারেশন থেকেই জঙ্গীবাদের ভাবাদর্শে মিলিট্যান্ট এক্টিভিষ্ট তৈরী হতে উর্বর পোতাশ্রয় নির্মিত হয়েছে। পহেলা বৈশাখ বাঙ্গালীর জাতিসত্বার স্রোতস্বনী নদীর মত সকল শাখা প্রশাখার সমুদ্রের মোহনা।

লেখক : এড. মিজানুর রহমান
জজ কোর্ট, লক্ষীপুর।
আইন উপদেষ্টা : রায়পুর নিউজ টুয়েন্টিফোর ডট কম

বাংলাদেশ সময়: ১৯:০২:৫৪ ● ৩০৮ বার পঠিত



পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)



আরো পড়ুন...