নতুন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন : ওয়াহহাব মিঞার পদত্যাগ
প্রথম পাতা » আইন-আদালত » নতুন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন : ওয়াহহাব মিঞার পদত্যাগ


শনিবার ● ৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৮

---অনলাইন ডেস্ক : দেশের ২২তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পেলেন সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। তার নিয়োগে শুক্রবার স্বাক্ষর করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। আজ শনিবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ নেবেন তিনি। এর আগে নানা নাটকীয়তার মধ্যে বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা পদত্যাগ করার পর থেকে প্রধান বিচারপতির পদটি শূন্য হয়। এরপর আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারক হিসেবে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা। তবে সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে রাষ্ট্রপতি দেশের জনগণের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটালেন বলে মনে করেন দেশের বিশিষ্ট আইনজীবীরা।

এদিকে সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে নিয়োগ দেয়ার পরই ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্বরত আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা গতকাল পদত্যাগ করেছেন। বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির কাছে তিনি পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হলে তিনি পদত্যাগ করবেন সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গনে এমন গুঞ্জন ছিল। এর মধ্যে গতকাল পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন তার পরিবারিক একটি সূত্র ।

গতকাল আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে প্রধান বিচারপতির নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে বলা হয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের ৯৫(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারক বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করেছেন। এই নিয়োগ তার শপথ গ্রহণের তারিখ থেকে কার্যকর হবে।
রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. জয়নাল আবেদীন জানান, নতুন প্রধান বিচারপতি হিসেবে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নিয়োগের আদেশে রাষ্ট্রপতি সই করেছেন। আগামীকাল (শনিবার) সন্ধ্যা ৭টায় নতুন প্রধান বিচারপতিকে শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি।
বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞাকে না রেখে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে আনার গুঞ্জন কয়েকদিন ধরেই চলছিল। গতকাল দুপুরের এক অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে বলেছিলেন, আমরা কোনো নাম প্রস্তাব করিনি। এটা রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার, এতে হাত দেয়ার সাহস আমার নেই।

এদিকে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে হবে বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে। বিচারক হিসেবে ওয়াহ্হাব মিঞার চাকরির বয়স আছে আর ১০ মাস। অন্যদিকে সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের চাকরি আছে আরো তিন বছর। বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞার দুই বছর পর ২০০১ সালের শুরুতে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারকের দায়িত্ব শুরু করেন সৈয়দ মাহমুদ হোসেন।

নানা নাটকীয়তার মধ্যে বিচারপতি এস কে সিনহা গত বছরের নভেম্বরে পদত্যাগ করার পর থেকে প্রধান বিচারপতির পদটি শূন্য। রাষ্ট্রপতি তখন আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারক মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে দায়িত্বটি পালন করে যেতে বলেন। সময় গড়ালেও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ না হওয়ায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রতিনিয়ত প্রশ্নের মুখে পড়ছিলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, এটা রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার বলে প্রশ্ন এড়াচ্ছিলেন তিনি। গতকাল দুপুরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, আমার মনে হয় মহামান্য রাষ্ট্রপতি আজকেই কিছুক্ষণের মধ্যে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির নাম ঘোষণা করবেন। এর ঘণ্টাখানেকের মধ্যে বঙ্গভবন থেকে তা নিশ্চিত করা হয়।

এই নিয়োগের বিষয়ে সাবেক আইনমন্ত্রী ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ মানবকণ্ঠকে বলেন, বিচারপতি সুরেন্দ্র কামার (এস কে) সিনহার নিয়োগের মেয়াদ ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত থাকায় আইন অনুযায়ী এতদিন প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে পারেননি রাষ্ট্রপতি। সেই আইনি বাধা কাটিয়ে সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে যোগ্যতার বিবেচনা ও উপযুক্ত মনে করে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। এ নিয়োগ দেয়ার এখতিয়ার শুধু রাষ্ট্রপতিরই রয়েছে। তিনি সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, প্রধান বিচারপতি হিসেবে উপযুক্ত সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। আমি এই নিয়োগে সন্তুষ্ট। সৈয়দ মাহমুদ হোসেন তার দক্ষতা ও যোগ্যতা দিয়ে ন্যায়বিচার করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন এই সাবেক আইনমন্ত্রী।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, আপিল বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ায় আমি খুবই খুশি হয়েছি। নদী রক্ষা, পরিবেশ রক্ষা ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধসহ সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় অনেক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। ঐতিহাসিক রায় দেয়ার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টে তার অনেক অভিজ্ঞতা রয়েছে। অতীতে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন তিনি।
সুপ্রিম কোর্টের একটি সূত্র জানায়, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন প্রধান বিচারপতি হয়েছেন জানার পর গতকাল দুপুরের আগে বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা তার চেম্বার থেকে বইপত্র নিয়ে গেছেন। এর আগে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের মাঝে গুঞ্জন ছিল প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ না দেয়া হলে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ এই বিচারপতি পদত্যাগ করতে পারেন। বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞার এ বছরের নভেম্বরে অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে।

অন্যদিকে সৈয়দ মাহমুদ হোসেন অবসরে যাবেন আরো তিন বছর। বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞার দুই বছর পর ২০০১ সালের শুরুতে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারকের দায়িত্ব শুরু করেন সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে নিয়োগ পাওয়া সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বিএনপি সরকার আমলে ২০০৩ সালে হাইকোর্টের স্থায়ী বিচারক হন। ২০১১ সালে তিনি আপিল বিভাগের বিচারক পদে উন্নীত হন। বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্?হাব মিঞার দায়িত্ব পালনের সময়সীমা ২০১৮ সালের ১০ নভেম্বর পর্যন্ত। আর বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের সময়সীমা ২০২১ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতি গঠিত দুটি সার্চ কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। এছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ টাইব্যুনালেরও চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আপিল বিভাগে এখন যে পাঁচজন বিচারপতি রয়েছেন, তার মধ্যে মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা জ্যেষ্ঠতম। তার পরেই বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। জ্যেষ্ঠতার ক্রমে এরপরে রয়েছেন বিচারপতি মো. ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার।

২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর বিচারপতি ইমান আলী অবসরে যাবেন। বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী অবসরে যাবেন ২০২৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর এবং বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার অবসরে যাবেন ২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি।

বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ১৯৮১ সালে জেলা আদালতে এবং ১৯৮৩ সালে হাইকোর্ট বিভাগের আইনজীবী হিসেবে নিবন্ধিত হন। এ সময় তিনি সুপ্রিম কোর্ট প্রতিনিধি হিসেবে দৈনিক সংবাদ পত্রিকায়ও কাজ করেছেন। ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। ২০০১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক নিযুক্ত হন। ২০০৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তিনি হাইকোর্টে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। ২০১১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি নিযুক্ত হন তিনি।

সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম সৈয়দ মুস্তফা আলী এবং মায়ের নাম বেগম কাওসার জাহান। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট উপজেলায়। তবে কুমিল্লা শহরের আদালত পাড়ার টিঅ্যান্ডটি মোড়ে তার পৈত্রিক বাড়ি রয়েছে। তার শ্বশুর আব্দুল খালেক সাবেক আইজিপি। তিনি বিএসসি ও এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়া লন্ডন ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ওরিয়েন্টাল আফ্রিকান স্টাডিজ এবং ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড লিগ্যাল স্টাডিজ থেকে ছয় মাসের কমনওয়েলথ ইয়াং ল’ ইয়ার্স কোর্স করেন।

২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। এরপর বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনায় বেশকিছু উদ্যোগ নিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি। সম্প্রতি নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে তার নাম। এ কারণে পদত্যাগ করেন তিনি। গত বছরের ১১ নভেম্বর এস কে সিনহার পদত্যাগপত্র পৌঁছায় রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের ঘটনা এটাই প্রথম। ২০১৭ সালের ১৪ নভেম্বর তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি। এরপর গতকাল পদত্যাগ করলেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো. আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা।

এর আগে এক মাসের ছুটি নিয়ে গত বছরের ১৩ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়ায় যান এস কে সিনহা। এই ছুটি শেষ হয় ১০ নভেম্বর। তার অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা। তার ২০১৮ সালের ১০ নভেম্বর পর্যন্ত চাকরির মেয়াদ রয়েছে।

বাংলাদেশ সময়: ১৮:৫৫:৫৫ ● ২৬২ বার পঠিত



পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)



আরো পড়ুন...