হাস্তানগরের রসি খাইতাম কত কষি : রায়পুর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর রসের ঐতিহ্য
প্রথম পাতা » ফটো গ্যালারি » হাস্তানগরের রসি খাইতাম কত কষি : রায়পুর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর রসের ঐতিহ্য


রবিবার ● ১৯ নভেম্বর ২০১৭

---মোঃ আজম : শীতের সকাল মানেই খেজুর রসের তৈরি নাস্তা, খেজুর রসের নাস্তা বা লোয়াখালীর ভাষায় রসের সিন্নি শীতের দিন সকালে থাকবে না এমটা যেন ভাবাই যেত না। কিন্তু কালের বিবর্তনে এখন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে অপূর্ব স্বাধের এই নাস্তার আয়োজন।

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে শীতের এই মিষ্টি মধুর নাস্তার আয়োজন আগে ব্যাপক ভাবে থাকলেও এখন সেটা শুধু কল্পনার ডায়েরিতে ধীরে ধীরে স্থান করে নিতে চলছে। হাঁড় কাঁপানো কাক ডাকা শীতের সকালে গায়ে চাদর আর কান-মাথা মাফলার দিয়ে মুড়িয়ে রস কিনতে যাওয়ার সেই আনন্দ এখন বিলিন হতে চলছে। রায়পুর উপজেলার সায়েস্তানগর,গাজীনগর,হায়দরগঞ্জ, খাঁসের হাট,উত্তর কেরোয়াসহ এইসব এলাকা গুলোতে খেজুর গাছের সংখ্যা ছিল বেশি এবং খেজুরের রস ও মিলতো প্রচুর। তন্মধ্যে রায়পুর বাজারের পশ্চিম দিক অর্থ্যাৎ সায়েস্তানগরের খেজুরের রস ছিল সবচাইতে সুস্বাধু এবং অধিক মিষ্টি, ফলে সকলের কাছেই সায়েস্তানগরের খেজুর রস ছিল অধিক প্রিয়।

বর্তমান রায়পুর বাজারের থানার উত্তর পূর্ব কর্নারের চৌরাস্তার মোড়ে বসতো খেজুর রসের বিশাল হাঁট, আনুমানিক চার পাঁচ লিটারের প্রতি হাঁড়ি রসের মূল্য ছিল সর্বোচ্চ আট নয় টাকা। কিন্ত কেউ যদি একসঙ্গে চার পাঁচ হাঁড়ি কিনতো তাহলে প্রতি হাঁড়ির দাম পড়তো মাত্র ৫ থেকে ৬ টাকা বা তার চাইতে একটু বেশি। কিন্তু এখন সময় এবং দিন পরিবর্তনের সাথে সাথে যেন সব কিছুই রুপ কথার গল্পের মত শুনা যায়। খেজুর গাছ না লাগানো,গাছের যত্ন না নেওয়া বা খেজুর গাছ রসের উদ্দেশ্যে কাটা থেকে বিরত থাকার দরুনই এমনটা হচ্ছে বলে অনেকে মনে করেন। অপরদিকে এখন এই এলাকার প্রায় প্রতি ঘরে ঘরেই রয়েছে প্রবাসী কর্মজীবি, ফলে গাছ গেটে রস আহরনের পদ্ধতি না জানা বা এই ব্যপারে সকলের উদাসীনতাটাই সবচেয়ে বেশি দ্বায়ি।

খেজুর রস দিয়ে তৈরি পিন্নি, পিঠা, পায়েশ ঘরের জন্য তো তৈরি হতই সাথে সাথে এ বাড়ী সে বাড়ী, বেয়াই বাড়ীতেও পাঠানোর ধুম পড়ে যেত। খেজুর রস দিয়ে তৈরি গুঁড় ( মিঠাই), বাটালী মিঠাই ইত্যাদি ছিল অপূর্ব স্বাধের। শীতের এই সময়ে রায়পুরের সায়েস্তানগরের বিভিন্ন বাড়ীতে গেলে দেখা যেত গৃহবধূরা রস দিয়ে গুঁড় তৈরি কাজে ব্যস্ত,যেন কথা বলার কোন সময় নেই। বাড়ীতে অনেকসময় মেহমান আসলে মুড়ি নারিকেল আর সাথে দেওয়া হতো খেজুর গুঁড় যার স্বাধ আর গন্ধ ছিল অতুলনীয়।---

নতুন ধানের আতপ চাল দিয়ে সাত সকালে খেজুর রস রান্নার ধুম থাকতো প্রতি ঘরে ঘরে, সেই সময় রায়পুরের পূর্ব সাইটের প্রায় মানুষের মুখে শুনতাম ‘হাস্তানগরের রসি খাইছি আইজগা কষি’ । সেই স্বাধ সেই মন মাতানো রসের গন্ধ আজ আর কোথায় মিলবে ! কালভাদ্রে এখনো যদি কোথাও মিলে তাহলে প্রতি হাঁড়ি রসের দাম মিলছে দুই থেকে তিন’শ টাকা মূল্যে, কিন্তু স্বাধ বা রসের গন্ধ কিছুই থাকছে না। শীতের মৌসুমে রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় যেমন নাকে লাগতো রসের মৌ মৌ গন্ধ তেমনি খেজুর গাছের দিকে তাকালে দেখা যেত মৌমাছি, মাছি আর পাখীদের কলরব।

রায়পুর বাজারের কুমার পাড়ায় কুমাররা থাকতো হাঁড়ি তৈরির কাজে ব্যস্ত, ক্রেতা-বিক্রেতা সবাই যেন ব্যস্ত সময় পার করতো। বাজারের উত্তর দিকে অর্থ্যাৎ মাংস হাঁটার এখানে বসতো খেজুর গুঁড়ের বাজার,কেউ পাতিলে করে গুঁড় নিয়ে আসতো কেউবা জগে ভর্তি, কেউবা কলসে ভর্তি করে গুঁড় নিয়ে আসতো বাজারে বেচার জন্য, বিশ টাকা পঁচিশ টাকাতে মিলতো প্রতি কেজি খেজুর গুঁড়। এই গুঁড় আর মুড়ির মিশ্রনে তৈরি মোয়া ( মোল্যা), গোল্লা পিটা (চাইন্না পিটা), ধুঁই পিঠা তৈরির কাজ রাতভর চলতো ঘরে ঘরে। মেয়ে জামাই বাড়ীতে এইসব পিঠা পায়েস না পাঠালে যেন শীত মৌসুমটাই মাটি হয়ে যেত।

কিন্তু বর্তমানে এখন আর কেউ উৎসাহ নিয়ে খেজুর গাছ ও লাগাচ্ছেনা বা খেজুর গাছ কেটে রস আহরনের সেই উদ্যেগ ও নিচ্ছে না। বর্তমান দিনে রায়পুরের এমনও অনেক জায়গা আছে যেখানে ৭/৮ এমনকি ১০/১১ বছরের বাচ্চারাতো জানেইনা খেজুর রস কি ! গত দেড় যুগ আগেও এই রসের ঐতিহ্য রায়পুরে থাকলেও এখন প্রায় বিলিন হতে চলছে খেজুর রস। আগামী এক দশক পরে হয়তো এখানকার ছেলে মেয়েরা জানবেই না খেজুর রস কিভাবে উৎপন হয় আর সেই রস কিভাবে খাওয়া হয় । রায়পুরে খেজুর রসের এই অইতিহ্যবাহী দিনগুলো হয়তোবা আর কোনদিনই ফিরে আসবেনা। একসময় মানুষও ভুলে যাবে খেজুর রসের স্বাধ আর মন মাতানো গন্ধ ।

বাংলাদেশ সময়: ২২:০৯:২৪ ● ১২১১ বার পঠিত



পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)



আরো পড়ুন...