খরস্রোতা ডাকাতিয়া নদীর বিপন্ন দশা
প্রথম পাতা » ফটো গ্যালারি » খরস্রোতা ডাকাতিয়া নদীর বিপন্ন দশা


মঙ্গলবার ● ৭ নভেম্বর ২০১৭

---নিউজ ডেস্কঃ ডাকাতিয়া একটি প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী নদী। বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা ছাড়াও অসংখ্য লোক কাহিনীতে পাওয়া যায় ডাকাতিয়ার নাম। বিস্তর জনশ্রুতিও রয়েছে এ নদীকে ঘিরে। ডাকাতিয়া উত্সস্থল ভারতের পার্বত্য ত্রিপুরার রঘুনন্দন পাহাড়ে। কুমিল্লা জেলার সোনাইমুড়ি সীমান্ত দিয়ে এ নদী প্রবেশ করেছে বাংলাদেশে। ডাকাতিয়া নদী বাংলাদেশ-ভারতে একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। নদীটি বাংলাদেশর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কুমিল্লা ও চাঁদপুর জেলার একটি নদী। এর দৈর্ঘ্য ১৪১ কিলোমিটার, গড় প্রস্ত ৬৭ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। ডাকাতিয়া নদী মেঘনার একটি উপনদী। নদীটি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড় থেকে উত্পন্ন হয়ে কুমিল্লা জেলার বাগসারা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং পরবর্তীতে চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুর জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এরপর কুমিল্লা লাকসাম ও চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলা অতিক্রম করে চাঁদপুরের কাছে মেঘনা মিলিত হয়েছে। নদীটি বর্ষাকালে ভারতের দিক থেকে বিপুলসখ্যক পাহাড়ি প্রবাহকে গ্রহণ করে। কিন্তু এসব উত্স থেকে আসা পানিপ্রবাহের পরিমাণ খুবই সীমিত এবং বছরের ৯ মাসই এই নদীটি মেঘনার জোয়ারের পানি গ্রহণ করে থাকে। নদীটি এক সময় লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার কাছে মেঘনায় মিলিত হতো। বর্তমানে ডাকাতিয়া বিভক্ত দু’ধারায়। মূল ধারাটি রায়পুরে মেঘনায় মিশেছে। অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে বড় ধারাটি পড়েছে চাঁদপুরের মেঘনায়।

এককালের খরস্রোতা ডাকাতিয়া নদী এখন মৃতপ্রায়। নদীতে নেই জোয়ার-ভাটার উত্তাল ঢেউ। অবৈধ দখল আর দূষণে ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে ডাকাতিয়া। চলতি শতকের শুরুর দশকেই ডাকাতিয়া বিপন্ন নদীতে পরিণত হয়। নদীর তলদেশে বড় বড় বালুচর, অবৈধভাবে তীরভূমি ভরাট ইত্যাদি কারণে কমছে পানিপ্রবাহ। লাকসামের উপরে দিয়ে বহমান ডাকাতিয়া দিন দিন সরু হয়ে হয়ে পড়ছে। নদীর জমিতে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করায় প্রশস্ততা নেমে এসেছে এক চতুর্থাংশে। ফলে নৌচলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। অনেকে স্থানে শুকনো মৌসুমে নদীটি প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়ে। সংস্কার না করায় ডাকাতিয়া আক্ষরিক অর্থেই বিপন্ন দশার মুখোমুখি।
নদী রক্ষায় বিভিন্ন সময় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টরা নানা প্রতিশ্রুতি শোনালেও এখন পর্যন্ত কার্যত কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। নদীর বিভিন্ন স্থানে কিছু ব্যক্তি বাঁধ দিয়ে পানির স্বাভাবিক গতিকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে। সাপের মতো এঁকেবেঁকে বয়ে যাওয়া ডাকাতিয়া ফরিদগঞ্জ উপজেলার প্রায় সবগুলো ইউনিয়নকে একসময় মায়ের মমতায় জড়িয়ে ছিল। উপজেলার প্রধান যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল এ নদী। ব্যবসায়ীদের একমাত্র ভরসা ছিল ডাকাতিয়া। কিন্তু একটু একটু করে নষ্ট করা হয়েছে এর নাব্য। এর ভূমি দখল হয়ে যাচ্ছে।---

প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলায় ডাকাতিয়া হারিয়ে ফেলছে তার অতীত ঐহিত্য। নদীটির বেশির ভাগ জায়গা দখল করে আছে কচুরিপানা। উপজেলার সচেতন নাগরিকরা মনে করেন প্রশাসন ইচ্ছে করলে দখল ও দূষণ রোধ করে সুস্থ নদীর তীরে সুস্থ শহর গড়ে তুলে এক আধুনিক ফরিদগঞ্জ উপহার দেয়া যায়। তারা সীমানা জরিপ করে ডাকাতিয়া নদী দখলমুক্ত করতে প্রশাসনের কাছে দাবি জানান। সময়ের পরিক্রমায় ডাকাতিয়া নদী নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে বর্তমানে সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় পড়েছে। বর্তমানে নদীটি সেচ প্রকল্পের অংশে পড়ায় পানি সীমিতকরণের আওতায় পড়ে এমনিতেই ক্ষীণ হয়ে গেছে। অন্যদিকে কিছু অপরিণামদর্শী মানুষের কাজের ফলে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ডাকাতিয়া। নদীর তীর থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন, তীরবর্তী বিভিন্ন স্থান দখল ও দূষণের ফলে নদীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। ফরিদগঞ্জ পৌর সদর বাজারের সব বর্জ্য কেরোয়া ব্রিজসংলগ্ন জায়গায় নদীতে ফেলা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ নীরব ভূমিকা পালন করছে। এ অবস্থায় নদী যেমন দূষিত হচ্ছে তেমনি দূষিত হচ্ছে পরিবেশও। কেরোয়া ব্রিজসংলগ্ন এলাকার বাতাস সবসময় দুর্গন্ধযুক্ত থাকে। পথচারীদের নাকে কাপড় দিয়ে পথ চলতে হয়।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী মত্স্য ও জলজপ্রাণীর জীবন ধারণের জন্য পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন প্রতি লিটারে ৫ মিলিগ্রাম বা এর ওপরে থাকা প্রয়োজন। ফরিদগঞ্জের ১নং বালিথূবা ইউনিয়নের টুগরী এলাকায় ডাকাতিয়ার পানির দূষণমাত্রা পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করে জানা যায়, এখানে পানিতে পিএইচের পরিমাণ ৭.২ এবং অক্সিজেনের পরিমাণ ৬.৫। তবে ফরিদগঞ্জ বাজারসংলগ্ন নদীতে পরিমাপ করলে ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠতো। আর এখন নদীতে পর্যাপ্ত পানি থাকায় প্রকৃত অবস্থাটা বোঝা যায়নি। শুকনো মৌসুমে পরিমাপ করলে নদীর দূষণের মাত্রা ভয়াবহভাবে চিত্রিত হতো। এ বিষয়ে উপজেলা মত্স্য কর্মকর্তা আবদুল আহাদ লাজু বলেন, কচুরিপানা অপসারণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। তবে অচিরেই ডাকাতিয়া নদীর কচুরিপানা অপসারণ করে সরকারের ফি বছর মাছের পোনা অবমুক্তি কর্মসূচির সফলতা আনয়নের লক্ষ্যে এডিবিতে প্রকল্প আকারে প্রস্তাবনা পাঠানো হবে। ফরিদগঞ্জ মত্স্য অফিসের ক্ষেত্র সহকারী নজরুল ইসলাম বলেন, পানিতে ডিওর মাত্রা প্রতি লিটারে ৬ মিলিগ্রামের নিচে নেমে গেলে ছোট ছোট মাছ বাঁচে না। এছাড়া প্রাণী বৈচিত্র্য নষ্ট হয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, ডাকাতিয়া নদীর ফরিদগঞ্জ অংশের পানিতে পিএইচের পরিমাণ ৭.২ এবং অক্সিজেনের পরিমাণ ৬.৫। ফরিদগঞ্জের কোথায় মাপা হয়েছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ১নং বালিথুবার টুগরী এলাকায়।

উল্লেখ্য, টুগরী এলাকায় নদীতে কোনো প্রকার বর্জ্য ফেলা হয় না। কাজেই এখানে কোনো পরিমাপ নদীর প্রকৃত অবস্থা চিত্রিত করবে না এটাই স্বাভাবিক। আর এখন নদীতে রয়েছে পর্যাপ্ত পানি। ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ড. শহীদ হোসেন চৌধুরী বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। ফরিদঞ্জ বাজারের কেরোয়া ব্রিজসংলগ্ন এবং ডাকবাংলো এলাকায় এমনকি উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ের পুকুরের পাশেও বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এসব অপসারণ করতে আমরা ‘পরিচ্ছন্ন ফরিদগঞ্জ’ নামে একটি কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে আমরা স্থানীয় সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও পৌরসভা কর্তৃপক্ষকে সঙ্গে নিয়ে বসেছি। পৌরসভা বলেছে ময়লা ফেলার জায়গা নেই। আমি বলেছি আপনার একটি নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করেন। সেখানে ব্যবস্থা করা হবে।
বাংলার নদী আমাদের বেড়ে ওঠার প্রেরণা। দেশের নদ-নদীগুলো আজ মরতে বসেছে। তার মধ্যে মরে যাচ্ছে ডাকাতিয়া নদী। বিগত দিনে এদের গর্জন যারা শুনেছেন তাদের পক্ষে বর্তমান করুণ দৃশ্য দেখে চোখের জল সংবরণ করা দায় হবে। মারাত্মক পরিবেশ ও কৃষি বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে চাঁদপুর-লক্ষ্মীপুর-নোয়াখালীর লাখ লাখ মানুষ। তাই ডাকাতিয়া নদী বাঁচাতে এগিয়ে আসতে হবে আমাদের।

বাংলাদেশ সময়: ০:৪৪:২৪ ● ৫৩০ বার পঠিত



পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)



আরো পড়ুন...